
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিয়োগের মধ্যে অন্যতম হলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ। ২০২৫ সালের নতুন বিজ্ঞপ্তিতে সারাদেশের ৬টি বিভাগে মোট ১০,২১৯ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি বিষয়ে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান) দক্ষতা অর্জন করতে হবে এবং নিয়মিত মক টেস্ট দিয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া এবং বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুশীলন করাও জরুরি।
প্রাইমারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির গুরুত্বপূর্ন তথ্য
● পদের নাম- সহকারী শিক্ষক
● পদ সংখ্যা- ১০,২১৯টি
● জব ক্যাটাগরি- সরকারি চাকরি
● বেতন কাঠামো - গ্রেড-১৩
● আবেদন শুরু- ০৮ নভেম্বর ২০২৫ (সকাল ১০:৩০ মি:)
● আবেদনের শেষ- ২১ নভেম্বর ২০২৫ (রাত ১১:৫৯ মি:)
আবেদনের যোগ্যতা
আবেদন প্রার্থীদের স্বীকৃত যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএ প্রাপ্ত প্রার্থীরাই আবেদন করতে পারবেন।
আবেদন পদ্ধতি
● প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত ওয়েবসাইটে (http://dpe.teletalk.com.bd ) প্রবেশ করলে আনলাইনে Application Form পূরণের নির্দেশনা পাওয়া যাবে। উক্ত নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক অনলাইনে Application Form পূরণ করে Submit করা হলে ওয়েবসাইট হতে প্রার্থীর User ID সহ Unpaid স্ট্যাটাস সম্পন্ন Draft Applicant's Copy সংগ্রহ করতে হবে।
● নির্ভুলভাবে পূরণকৃত Application Form-এর বিপরীতে প্রদত্ত User ID ব্যবহার করে পরবর্তী ৭২ ঘন্টার মধ্যে Draft Applicant's Copy-তে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক যে কোন টেলিটক প্রি-প্রেইড মোবাইল নম্বর হতে SMS-এর মাধ্যমে অফেরতযোগ্য ১০০.০০ (একশত) টাকা আবেদন ফি এবং টেলিটকের সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট ১২,০০ (বার) টাকাসহ একত্রে মোট ১১২.০০ (একশত বার) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
পরীক্ষা পদ্ধতি-
প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এমসিকিউ আকারে হয় যা লিখিত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি দুই ধাপে শেষ হয়। প্রথম ধাপে ৯০ মার্কের এমসিকিউ ভিত্তিত লিখিত পরীক্ষা হবে। এমসিকিউ পরীক্ষার জন্য মোট সময় বরাদ্দ ৯০ মিনিট। দ্বিতীয় ধাপে ১০ মার্কের মৌখিক পরীক্ষা হবে। লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার উভয় ক্ষেত্রে পাশ মার্ক ৫০%।
● এমসিকিউ ভিত্তিক লিখিত পরীক্ষা - ৯০ মার্ক
● মৌখিক পরীক্ষা - ১০ মার্ক
প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস ও মানবন্টন
এমসিকিউ ভিত্তিক লিখিত পরীক্ষার মোট নাম্বার ১০০। তারমধ্যে এমসিকিউ পদ্ধতিতে ৯০ মার্কের পরীক্ষা হবে যার সিলেবাস
● বাংলা ২৫ মার্ক
● ইংরেজি ২৫ মার্ক
● গণিত ও দৈনন্দিন বিজ্ঞান ২০ মার্ক
● সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) ২০ মার্ক
● মৌখিক পরীক্ষা ১০ মার্ক
বাংলা প্রস্তুতি
প্রাইমারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগে বাংলা থেকে ২৫ টি প্রশ্ন আসবে। বিগত সময়ের আলোকে দেখা যায় বাংলা ব্যকরন অংশ থেকে বেশি প্রশ্ন আসে। সাহিত্য অংশ থেকে ৩ থেকে ৫ টি প্রশ্ন আসে। নিয়মিত অনুশীলন ও বিগত সালের প্রশ্ন পড়লে বাংলা অংশে ভালো মার্ক পাওয়া যায়। ব্যাকরণ থেকে ভাষা, বর্ণ, শব্দ, সন্ধি বিচ্ছেদ, কারক, বিভক্তি, উপসর্গ, অনুসর্গ, ধাতু, সমাস, বানান শুদ্ধি, পারিভাষিক/সমার্থক/বিপরীত শব্দ, বাগধারা, এক কথায় প্রকাশ, বাক্য পরিবর্তন। বাংলা অংশে ভালো মার্ক পেতে কিছু পরামর্শ মেনে চলা যায়-
● বিসিএস সহ গুরুত্বপূর্ন সরকারি চাকরি পরীক্ষার বাংলা অংশের প্রশ্ন সমাধান করা ও ব্যাখ্যা পড়া। অনেক সময় ব্যাখ্যা বা সঠিক উত্তর নয় এমন অপশন থেকে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন করা হয়।
● ব্যাকরণ অংশে বেশি গুরুত্ব দেয়া।
● ৯ম-১০ম শ্রেনির বোর্ড ব্যাকরণ বই পড়া।
● বিগত সালের প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষার সকল প্রশ্ন পড়া।
ইংরেজি প্রস্তুতি
চাকরির পরীক্ষার পড়াশোনায় মধ্যে যেসব বিষয়ে গোছানো প্রস্ততি নেয়া যায় তারমধ্যে অন্যতম হলো ইংরেজি। ইংরেজি তে দুইটি মুল ভাগ দেখা যায় গ্রামার আর ভোকাবুলারি। যদিও সব কিছু পড়তে হবে তবুও ভোকাবুলারি অংশে খুব অল্প সময়ে ভালো করা কঠিন। তবে গ্রামার অংশে ভালো করা যায়। সিলেবাস ধরে গ্রামার অংশে প্রস্তুতি নিলে ভালো মার্ক পাওয়া যায়। ইংরেজির জন্য Tense, Preposition, Parts of Speech, Voice, Narration, Spelling, Sentence Correction, Right form of verb, Article, Phrase and Idoims পড়তে হবে। ইংরেজি তে ভালো করতে করনীয়-
● গুরুত্বপূর্ন অধ্যায় গুলো আগে পড়া ও বেশি প্রশ্ন আসে এমন টপিকে বেশি সময় দেয়া।
● গ্রামার অংশ থেকে বেশি প্রশ্ন আসে তাই গ্রামার অংশে বেশি জোর দেয়া।
● গুরুতপূর্ন কিন্তু আপনি পারেন না এমম টপিকে বেশি সময় দিয়ে আয়ত্ত করা।
● প্রাইমারি বিগত সালের প্রশ্ন এনালাইসিস করা ও ইংরেজি অংশের সকল প্রশ্ন ব্যাখ্যা সহ সমাধান করা।
● বিসিএস এর প্রশ্ন থেকে ইংরেজি প্রশ্ন পড়া।
গণিত ও দৈনন্দিন বিজ্ঞান প্রস্তুতি
চাকরির পরীক্ষার ট্রাম কার্ড হলো গণিত। চাকরির পরীক্ষায় ভালো করার অন্যতম হাতিয়ার গণিত। গণিতে ভালো মার্ক পেতে যে অধ্যায় গুলোতে মনোযোগ দিতে হবে তা হলো- পাটিগণিতের পরিমাপ ও একক, ঐকিক নিয়ম, অনুপাত, শতকরা, সুদকষা, লসাগু, গসাগু, লাভক্ষতি, ভগ্নাংশ, গড়। বীজগণিতের সাধারণ সূত্রাবলি, মাননির্ণয়, উৎপাদক, বাস্তব সংখ্যা। জ্যামিতি অংশে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বর্গক্ষেত্র, রম্বস, বৃত্ত ইত্যাদি। এছাড়া ৮ম থেমে ১০ম শ্রেনির সাধারণ গণিত বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের অনুশীলনি থেকে সরাসরি প্রশ্ন আসে। তাই বোর্ড বই থেকে অংক সমাধান ও প্রাকটিস করতে হবে।
অন্যদিকে বিজ্ঞান এ ভালো করার জন্য ১০ম থেকে ৪৯তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞান অংশে আসা এমসিকিউ সমাধান করতে হবে। এর বাইরে বাজার থেকে যেকোন পাবলিকেশনের একটা বই ভালো ভাবে পড়তে হবে এবং রিভিশন দিতে হবে।
সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক)
সাধারণ জ্ঞান অংশের সিলেবাস অনেক বড় এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য সংযুক্ত হচ্ছে। সাধারণ জ্ঞান হিসেবে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশের এমসিকিউ তে বেশি মার্ক পেতে প্রচুর পড়াশোনার কোন বিকল্প নেই।
দুই বিষয়ের বিগত সালের প্রশ্ন এনালাইসিস করে বার বার আসে এমন বিষয় গুলো সবার আগে ভালো ভাবে আয়ত্ত করতে হবে। বাংলাদেশ অংশের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলার প্রাচীনযুগ ও মধ্যযুগ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু, বিখ্যাত স্থান ও ঐতিহ্য, জাতিগোষ্ঠী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিভিন্ন সম্পদ, জাতীয় দিবস, মুঘল ও ইংরেজ আমল ভালো করে পড়তে হবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অংশে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, দেশ, মুদ্রা, রাজধানী, দিবস, নোবেল পুরস্কার, খেলা ও সম্মাননা, আন্তর্জাতিক সংগঠন, ভৌগোলিক ভালো করে পড়তে হবে।
প্রাইমারি নিয়োগ প্রস্তুতির পরামর্শ-
● সিলেবাস বিশ্লেষণ করা: অন্যান্য সকল সরকারি চাকরির পরীক্ষার মত প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির শুরুটা সিলেবাস এনালাইসিস থেকে শুরু করা সব থেকে ভালো। এতে করে প্রশ্ন কেমন আসবে, কোন কোন বিষয়ে কত নম্বর বরাদ্দ আছে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
● বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি: নিজের পড়াশোনা আর দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলা অংশের প্রস্তুতির জন্য ব্যাকরণ, সাহিত্য এবং সমাস, এক কথায় প্রকাশ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলোতে বেশি মনোযোগ দিন। ইংরেজি অংশে গ্রামার, ভোকাবুলারি ও কমন টপিক গুলো বেশি পড়তে হবে। গণিতে ভালো করার জন্য প্রাথমিক গণিত, যেমন – পাটিগণিত, জ্যামিতি এবং অন্যান্য গাণিতিক সমস্যা সমাধানের অভ্যাস করুন। সেই সাথে নিয়মিত সমাধানের অভ্যাস করতে হবে। সাধারণ জ্ঞান অংশ অনেক বড়, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি, এবং সাধারণ বিজ্ঞান থেকে গুরুত্বপূর্ন ও বিগত সময়ে যে টপিকস থেকে প্রশ্ন এসেছে তা পড়তে হবে।
● বেশি বেশি মক টেস্ট দেয়া ও অনুশীলন করা: যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নিজের অবস্থান যাচাই করতে এবং দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে নিয়মিত মক টেস্ট দিতে হয়। মক টেস্টের ফলাফল পর্যালোচনা করে পড়াশোনা করতে হবে। এছাড়া সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশ্ন সমাধানের জন্য দরকার নিয়মিত অনুশীলন করা।
● বিগত বছরের প্রশ্নপত্র: সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিগত বছরের প্রশ্নপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে কোন ধরনের প্রশ্ন বারবার আসে তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়ার বিকল্প ও কার্যকর কোন উপায় নেই। এই একটা কৌশল আপনাকে বাকিদের থেকে আলাদা করবে।
● দরকার সঠিক গাইডলাইন: অনেক পড়াশোনা করেও ভালো ফলাফল পাবেন না যদিনা একটি ভালো গাইডলাইন অনুসরণ করলে প্রস্তুতি নেন। সঠিক গাইডলাইন হিসেবে ভালো বই বা অনলাইন রিসোর্সের সাহায্য নেয়া ও পরীক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ন তথ্যের উৎস।
● গ্রুপ স্টাডি করা - গ্রুপ স্টাডি হল পড়াশোনা বা চাকরির প্রস্তুতিতে সফল হওয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি। সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে পড়াশোনা করলে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের চিন্তা বিনিময় করা যায়, অনেক টপিকে সন্দেহ বা অনিশ্চয়তা দূর করা যায়। তাই সুযোগ থাকলে গ্রুপ স্টাডি করা যেতে পারে।
● গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নোট করে পড়া - প্রস্তুতির সময়, চাকরির পরীক্ষার প্রাসঙ্গিক বিষয় চিহ্নিত করে নোট করে নিতে হবে। এটে দ্বিতীয়বার পড়ার সময় রিভিশন দেয়া সহজ হবে।
● নিয়মিত রিভিশন দেয়া - চাকরির প্রস্তুতির সব থেকে বড় ভুল পর্যাপ্ত রিভিশন না দেয়া। প্রস্তুতির ভালো পদ্ধতি হলো মুল বই পড়ার থেকে রিভিশন বেশি দিতে হবে।
● স্যোশাল মিডিয়ার সদব্যবহার- বর্তমান সময়ে স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার থেকে বিরত থাকা আমাদের কারো পক্ষ্যেই সম্ভব না। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারে একদিকে আমাদের সময় অপচয় অন্যদিকে আমাদের মনোযোগ চলে যায়। এক্ষেত্রে সমাধান হলো- প্রথমত কম ব্যবহার করা এবং দ্বিতীয়ত সুপরিকল্পিত ভাবে আমাদের কাজে দিবে এমন ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে লাইক দিয়ে ফলো করা ও চাকরির প্রস্তুতির জন্য দরকারি তথ্য সংগ্রহ করা।
বর্তমানে প্রাইমারি সহকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনেক প্রতিযোগিতামূলক। তবে যেহেতু অনেক বেশি পদে নিয়োগ হয় তাই একটু পরিশ্রম করলেই পাশ করে চাকরি নিশ্চিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।