
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে ব্যাংক জব অনেকের কাছে জনপ্রিয়। ব্যাংকের কাজ, কাজের পরিবেশ, ক্যারিয়ার সম্ভাবনা, প্রমোশন সুবিধাসহ অন্যান্য অনেক কারনে ব্যাংক জব অনেকের পছন্দনীয়। তাছাড়া অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগ দুর্নীতি, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, অল্প পদ সংখ্যা অনেক প্রার্থীকে ব্যাংক জবে আগ্রহী করে।
কেন ব্যাংক জব ভালো?
বাংলাদেশে কেরিয়ার হিসেবে ব্যাংক জব স্থিতিশীলতা ভালো বেতন আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেয়। সামাজিক মর্যাদা সহ তুলনামূলক দ্রুত চাকরি পাওয়া যায়। ব্যাংকে চাকরির সুবিধা-
ব্যাংক চাকরির ধরণ ও রকমফের
সরকারি বেসরকারি চাকরির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। আবার একই ব্যাংকে কয়েকধরনের পদে নিয়মিত নিয়োগ দেয়া হয়। ব্যাংক জবের ধরন বলতে সরকারি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রাইভেট ব্যাংক এর চাকরি এভাবে ভাগ করা যায়।
সরকারি ব্যাংক চাকরি
সরকারি ব্যাংক বলতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত ব্যাংক গুলোর বিভিন্ন পদে চাকরি কে বোঝার। ব্যাংকার সিলেকশন কমিটি এসব ব্যাংকের নিয়োগ দিয়ে থাকে। সম্পূর্ন সরকারি মালিকানায় বাংলাদেশের সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলো হলো-
১। অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি
২। জনতা ব্যাংক পিএলসি
৩। রূপালী ব্যাংক পিএলসি
৪। সোনালী ব্যাংক পিএলসি
৫। বেসিক ব্যাংক পিএলসসি
৬। বাংলাদেশ ডেভলাপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি
বাংলাদেশ ব্যাংক চাকরি
বাংলাসেশের সরকারের প্রধান ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রা প্রচলন, নোট ছাপানো, মুদ্রা হার ঠিক রাখা সহ সকল ব্যাংকের ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে। বর্তমানে দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০টি শাখা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার কর্মকর্তা কর্মচারিদের অনেক সুবিধা দিয়ে থাকে-
প্রতিবছর ২ টি উৎসব ভাতা
(ক) বার্ষিক লাভের উপর বোনাস
(খ) সল্প সুদে ঋন সুবিধা
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত নিয়োগ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয় এমন পদের সংখ্যা ৩ টি
১) সহকারী পরিচালক,
২) অফিসার (জেনারেল) ও
৩) ক্যাশ অফিসার।
প্রাইভেট ব্যাংক চাকরি
বাংলাদেশে প্রায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি ব্যাংক আছে। এই ব্যাংক গুলো ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত। বেসরকারি ব্যাংক গুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিং সিস্টেমে পরিচালিত হয়। বেসরকারি ব্যাংক গুলো তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি তাদের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অফিসিয়াল পেজ ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে।
ব্যাংক প্রিলি পরীক্ষার মানবণ্টন ও সিলেবাস
নিয়োগ পদ্ধতি
বাংলাদেশ ব্যাংক সহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পদ্ধতি একই রকম। এসব ব্যাংক পরীক্ষায় প্রার্থীকে তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
(ক) প্রিলিমিনারি ১০০ মার্ক (এমসিকিউ পরীক্ষা)
(খ) লিখিত ২০০ মার্ক
(গ) মৌখিক পরীক্ষা ২৫ মার্ক
বাংলাদেশ সরকারি ব্যাংকগুলোর নিয়োগ পরীক্ষা ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি টেন্ডার দিয়ে বিভিন্ন নিয়োগ প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করে থাকে। সরকারি চাকরি উত্তরপত্র মূল্যায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ,বসায় শিক্ষা অনুষদ, আইবিএ, ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট।
ব্যাংক জবের লিখিত পরীক্ষা
সরকারি ব্যাংক জব পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে লিখিত পরীক্ষার উপর। মৌখিক পরীক্ষার ২৫ নম্বরের সাথে লিখিত পরীক্ষার নাম্বার যুক্ত করে ফাইনাল মেধা তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সেই মেটাতালিকার ভিত্তিতে চাকরি প্রদান করা হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বার চূড়ান্ত মেধা তালিকা তৈরিতে বিবেচনা বিবেচনা করা হয় না। ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষা ২০০ নম্বরের হয় যার জন্য সময় বরাতে থাকে দুই ঘন্টা।
লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে
· ফোকাস রাইটিং
· প্যাসেজ
· আবেদন পত্র
· অনুবাদ
· গণিত
ব্যাংক জব মৌখিক পরীক্ষা
বিসিএস এর মতো ব্যাংক জবের জন্য খুব বেশি প্রস্তুতি নিতে হবে এমন না। তুলনামূলক কম প্রস্তুতিতে ব্যাংক জবের মৌখিক পরীক্ষার ভালো করা যায়। সাধারণ ও কমন প্রশ্নের বাইরে ব্যাংকিং ও অর্থনীতি সংক্রান্ত আপনার জ্ঞান, ব্যাংক ও অর্থনীতি সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলি ও আপনার স্মার্টনেস ও প্রেজেন্টেশন দক্ষতা প্রয়োজন। ইতিবাচক মানসিকতা ও ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা আপনাকে বাকি চাকরি প্রার্থীদের থেকে এগিয়ে রাখবে।
ব্যাংক জব প্রস্তুতির ধাপ
· লক্ষ নির্ধারণ করা
· সিলেবাস সম্পর্কে ধারণা নেয়া
· বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করা
· বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি নেয়া
· সাম্প্রতিক তথ্য জানা
· গুরুত্বপূর্ন টপিক নোট করা ও রিভিশন দেয়া
বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি
বাংলাদেশের চাকরির বাজার দিন দিন কঠিন হচ্ছে। ব্যাংক বহির্ভূত সরকারি চাকরির দীর্ঘসূত্রিতা অনেককেই ব্যাংক জবের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কঠিন প্রতিযোগিতায় সফল হতে দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক প্রস্তুতি। ব্যাংক চাকরিতে প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাকরি প্রার্থীকে প্রত্যেক বিষয়ে আলাদা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা মূলক পরিকল্পিত প্রস্তুতি নিতে হবে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রস্তুতি
ব্যাংকে চাকরির পরীক্ষার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সাহিত্য থেকে যে প্রশ্ন আসে তার বেশিরভাগ ব্যাকরণ থেকে। তাই এই অংশের প্রস্তুতিতে ব্যাকরণে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাহিত্য অংশে সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। কম পড়ে বেশি কমন পাওয়া যায়। সাহিত্য অংশে সবার প্রথমে পিএসসির ১১ জন সাহিত্যিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। সাহিত্য পত্রিকা চর্যাপদ মধ্যযুগের সাহিত্য ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকরণ অংশে নবম দশম শ্রেণীর ব্যাকরণ বই ভালোভাবে পড়তে হবে।
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য প্রস্তুতি
বিসিএস ছাড়া অন্যান্য চাকরির পরীক্ষার জন্য ইংরেজি সাহিত্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও ১০ম থেকে ৪৯তম বিসিএস পর্যন্ত আসা সাহিত্য অংশের প্রশ্ন ব্যাখ্যা সহ পড়া ভালো। ব্যাংকের পরীক্ষায় ইংরেজি অংশে ভোকাবুলারি গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে ভালো করার জন্য যে সব টপিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ-
Synonym- Antonym
One Word Substitution
Preposition
Phrase and Idioms
Sentence Correction
Voice
Right from of Verb
Narration
Spelling
Analogy
গণিত প্রস্তুতি
যেকোনো চাকরির পরীক্ষার ট্রাম কাড হলো গণিত। কোন প্রার্থী গণিত অংশে ভালো করলে অনেক সহজে যে কোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাশ করা তার জন্য সহজ। ব্যাংক জবের মত চাকরির পরীক্ষায় গণিত অংশে ভালো করার জন্য নিয়মিত অনুশীলন দরকার। অন্যদিকে ব্যাংক পরীক্ষায় সকল গণিত প্রশ্ন ইংরেজিতে করা হয়। আর প্রশ্নগুলোর সাইজ কিছুটা বড় থাকে তাই অভ্যাস না থাকলে পরীক্ষার হলে সকল প্রশ্নের উত্তর করা কঠিন হয়ে যাবে। যদিও শর্টকাট ভাবে গণিত প্রশ্ন সমাধান করা যায় তবুও গণিতে ভালো করতে কিছু পরামর্শ
· গণিতে নিজের ব্যাসিক ঠিক করতে হবে। তাই প্রস্তুতির শুরুতে মাধ্যমিকের গণিত বই থেকে উদাহরণ ও অনুশীলনী থেকে প্রশ্ন সমাধান করে ব্যাসিক ঠিক করতে হবে।
· বাজার থেকে একটি বই কিনে সেই বই থেকে বুঝে বুঝে ও লিখে গণিত প্রশ্ন অনুশীলন করতে হবে।
· বিগত সালের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো বাছাই করে সেগুলোতে আগে দক্ষ হতে হবে।
· সর্বোপরি প্রতিদিন অল্প হলেও গণিত অংশে সময় দেয়া ও প্রশ্ন সমাধান করতে হবে।
সাধারণ জ্ঞান প্রস্তুতি
যেকোনো চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি সাধারণ জ্ঞান অংশ ছাড়া প্রায় অসম্ভব। তুলনামূলকভাবে সিলেবাস বড় ও পড়া বেশি হলেও সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্ন কমন আসে সেই সাথে এ অংশের প্রশ্নের উত্তর করা যায়। ব্যাংক চাকরির পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞান অংশে সাম্প্রতিক তথ্য থেকে বেশি প্রশ্ন আসে। তাই বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক দুই অংশের জন্যই সাম্প্রতিক তথ্য জানতে হবে। সাধারণ জ্ঞান অংশে ভালো করার জন্য -
· প্রথমে যেকোনো প্রকাশনীর একটি বই থেকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশের প্রস্তুতি নিতে হবে।
· নিয়মিত পত্রিকা বা মাসিক সংকলন থেকে সাম্প্রতিক তথ্য জেনে রাখতে হবে। সাম্প্রতিক তথ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো খেলাধুলা, পদক ও পুরস্কার, সম্মেলন, সংগঠন আপডেট ও বৈশ্বিক কোন আলোচিত ঘটনা ইত্যাদি।
কম্পিউটার ও আইসিটি প্রস্তুতি
ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় কম্পিউটার ও আইসিটির প্রশ্ন কমন পেতে প্রথমে বিগত সালের প্রশ্ন সমাধান করতে হবে। বারবার আসে এমন টপিক ভালো করে বিস্তারিত পড়ে তার সকল এমসিকিউ সমাধান করতে হবে। আইসিটি অংশের গুরুত্বপূর্ণ টপিকস-
· কম্পিউটার পেরিফেরাল
· হার্ডওয়ার ও সফটওয়্যার
· নেটওয়ার্ক সিস্টেম
· সাইবার ক্রাইম
· মোবাইল টেকনোলজি
· সোশ্যাল মিডিয়া
· ক্লাউড কম্পিউটিং
· নাম্বার সিস্টেম
ব্যাংকের চাকরির পুষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
· সঠিক গাইডলাইনের জন্য একজন ভালো মেন্টর খোঁজা ও নিয়মিত তার থেকে পরামর্শ নেয়া।
· নিয়মিত পড়াশোনা করার জন্য নিজস্ব রুটিন তৈরি করা।
· বেশি বেশি রিভিশন দেওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোট রাখা।
· নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে মডেল টেস্ট দেয়া।
· মডেল টেস্ট বিশ্লেষণ করে ভুল ও দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে সেই বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া।
· বিগত সালের প্রশ্ন অনুশীলন করা।
· অনলাইনে ফ্রি মডেল টেস্ট দেয়া।
· এক্সাম ব্যাচে ভর্তি হওয়া।।
ব্যাংক জব প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি পরামর্শ
· চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি এমন না একটানা একমাস পড়াশোনা করলাম আর চাকরি পেয়ে গেলাম। চাকরি পাওয়ার জন্য দরকার অধ্যাবসায় আর নিরলস পরিশ্রম ও পড়াশোনা। তবে সফল ব্যাংক জব প্রস্তুতিতে একজন প্রার্থীর অবশ্যই করণীয়-
· বিগত সালের ব্যাংক জবের প্রশ্ন করা।
· বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি হিসেবে গণিত ও ইংরেজি অংশে দক্ষতা অর্জন। কারণ পেলি ও লিখিত দুই অংশেই ইংরেজি ও গণিত অনেক মার্ক কাভার করে।
· গণিত ভালো করতে নিয়মিত অনুশীলন ও ইংরেজিতে প্রশ্ন পড়া ও সমাধান অভ্যাস করা।
· ইংরেজি ভালো করতে গ্রামারের বেসিক ঠিক রাখা ও ভোকাবুলারিতে জোর দেওয়া। হ্যান্ড রাইটিং ও অনুবাদ অনুশীলন করা।